অ্যালোপেশিয়া, মাথার চুল ঝরে যাওয়ার এ রোগ কেন হয়, লক্ষণ আর নিরাময় কী?
স্বাভাবিকভাবে মাথার চুল পড়ে যাওয়াকে চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় বলে অ্যালোপেসিয়া। ৭০ বছর বয়সী নারীদের অন্তত ৪০ শতাংশ এই রোগে ভোগেন। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা NHS বলছে দৈনিক ৫০ থেকে ১০০ টি চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে এর থেকে বেশি চুল পড়ে গেলে এবং একই অনুপাতে নতুন চুল না গজলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যালোপেসিয়া বলা হয়। চুল পড়ার পর নতুন চুল না গজালে মাথার বিভিন্ন জায়গায় বা সম্পূর্ণ স্থানে যে টাক পড়ে সেটিও কিন্তু এই রোগের কারণে হয়ে থাকে। NHS দাবি করছে বিশ্বে প্রায় ১৪ কোটিরও বেশি মানুষ অ্যালোপেসিয়া রোগে আক্রান্ত, অর্থাৎ কারো পূর্ণ অথবা কারো আংশিক টাক রয়েছে।

কিভাবে বুঝবেন আপনার অ্যালোপেসিয়া হয়েছে?
সাধারণত আমাদের একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে মাথার চুল পড়তে শুরু করে, এক্ষেত্রে একেক জনের একেক সময় সেটি শুরু হয়, আর চুল পড়ার ধরণ ও হয় আলাদা আলাদা। অর্থাৎ কারো বেশী, কারো কম। কিন্তু অ্যালোপেসিয়া হলে স্বাস্থবান লোকের মাথার বা শরীরের চুল হঠাৎ পড়ে যেতে শুরু করে এবং তার ধারাবাহিক ভাবে পড়তে থাকে। কখনও একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চুল পড়ে, কখনো আবার পুরো মাথা থেকে সব চুল ই পড়ে যায়। কখনো বা ভ্র বা চোখের পাপড়ি সহ সারা শরীরের লোম পড়ে যায়।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কোন বয়সেই এই রোগ হতে পারে। এমনকি এর শিকার হতে পারে শিশুরাও, সে কারণেই এই রোগের উপসর্গ হয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন। তবে যদি হঠাৎ লক্ষ্য করেন চুল আঁচড়াতে গিয়ে চিরুনি ভর্তি করে অস্বাভাবিক ভাবে চুল পড়তে শুরু করেছে, কিংবা বিছানা-বালিশ ভরে যাচ্ছে ঝরে যাওয়া চুলে অথবা মাথার এক বা একাধিক জায়গায় ১ সেন্টিমিটার থেকে ৫ সেন্টিমিটার এলাকায় চুল একসাথে খালি হয়ে গেছে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

কেন হয় অ্যালোপেসিয়া?
নানান কারণে চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগের উৎপত্তিতে বংশগত প্রভাব রয়েছে। ১০ থেকে ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীর পারিবারিক ইতিহাস থাকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন চুল পড়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া, ফলে স্বাভাবিক চুল পড়ার হার দেখে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। কখনো অত্যাধিক চুল পড়া হতে পারে অন্য কোন শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ অর্থাৎ শরীরের কোন ঘাটতির কারণে চুল পড়া শুরু হতে পারে। তবে আমাদের দেশে এই রোগে আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই প্রচলিত কিছু চিহ্ন দেখা যায়।
যেমন মাথায় ৩ পয়েন্টের মতন দাগ আসা যা সাদা দাগ বা ছোপ ছোপ দেখায়। নক রুক্ষ হয়ে যাওয়া নখের যে স্বাভাবিক মসৃণতা রয়েছে তা কমে যাওয়া। এমনকি নখ পাতলা হয়ে যাওয়া বা ভেঙেও যেতে পারে। এ রোগের চুল পড়া ছাড়া সাধারণত অন্য কোন সমস্যা যেমন চুলকানি বা ব্যথা অনুভূত হয় না। ভয়ের বিষয় হলো এই রোগের সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অটোইমিউন রোগের যোগাযোগ রয়েছে। যেমন সেটি থাইরয়েড গ্রন্থি জনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস, ডাউন সিনড্রোম, এপিক ডার্মাটাইটিস ইত্যাদি।
এখন চলুন মাথার চুল ঝরে যাওয়ার এ রোগ কেন হয়, লক্ষণ আর নিরাময় কী?
আপনার চুল গুলো আপনার সৌন্দর্য্যের আসল কারণ কিন্তু সেই চুল যখন ঝরতে শুরু করে তখন আপনার মাথায় টাক দেখা যায়। আর তাই এবার আমরা বলব মাথার চুল ঝরে যাওয়ার রোগ কেন হয় এই ব্যাপারে এন্ড এর পেছনে সাইন্টিফিক কারণ টা আসলে কি? আর তার সাথে এটাও জানব যে যদি আপনার চুল ঝরে যাওয়ার রোগ হয় তাহলে সেটা কি করে আটকাবে, শুধু এটুকুই নয় এছাড়াও এমন কিছু কথা বলব যেগুলো আপনার আপনার মাথায় চুল ঝরে যাওয়া রোগের কারণ।
তো সবার আগে বলবো যে চুল ঝরে যাওয়ার রোগ আসলে কেন হয়? বা এর পেছনের প্রধান কারন টা আসলে কি? তো যে হবে প্রত্যেক গাছের শিকড় থাকে যার মাধ্যমে সে খাদ্য ও পানি গ্রহণ করে নিজের ভরণ পোষণ করে। ঠিক সেভাবেই আমাদের চুলের ও শিকড় থাকে। আর আমাদের চুল সেখান থেকে পুষ্টি নিয়ে থাকে। আর এই পার্ট টিকে হেয়ার ফলিকল বলা হয়। আমাদের চুলের ৩টি স্টেজ থাকে প্রথম স্টেজ কে বলা হয় গ্রোথ স্টেজ। কারণ এই স্টেজে আমাদের চুল বড় হয়, যেমন ১৭ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমাদের বডির বিকাশ ঘটে, ঠিক তেমনি এই স্টেজে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত আমাদের চুল বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আমাদের শরীরে যত চুল আছে তার মধ্যে ৯০ শতাংশ চুল এই স্টেজ ই তৈরি হয় এবং এরপর ই দ্বিতীয় স্টেজের শুরু হয়। যাকে কেটাজেন বলা হয়। এই স্টেজ টি ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত থাকে, আর এই স্টেজে চুলের খুব কম গ্রোথ হয় আর ফলিকল অনেক ছোট হয়ে যায়। তারপর তৃতীয় স্টেজের শুরু হয় টেলোজেন এই স্টেজকে রেস্টিংফেজ ও বলা হয়, এই স্টেজে আমাদের চুলের গ্রোথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং আমাদের চুলের ফলিকল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। আর তখনই এটাকেই আমরা চুল ঝরে যাওয়া বলি। এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকদিন আমাদের শরীরের প্রায় ১০০ টারও বেশি চুল ফালিকল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে আর সেখান থেকে দ্বিতীয় বার চুল তৈরি হওয়া শুরু হয়। আর এই প্রক্রিয়া সারাজীবন চলতেই থাকে, পুরনো চুল ঝরে যায় আবার নতুন চুল গজায়।
আমাদের সমস্ত রকম নিউট্রিয়েন্টস পায় ফলিকল থেকে কিন্তু মানুষের চুলের এই ফলিকল আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যায় এবং তাদের চুল সঠিক পরিমাণে নিউট্রিয়েন্টস পায় না, আর সেই কারণেই তাদের চুল ঝরে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার আর গজায় না আর এই স্টেজকে আমরা টাক পড়ে যাওয়া বলি। যখন বাচ্চারা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে তখন তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন তৈরি হয়,এই হরমোন ফিমেলদের শরীরে অনেক কম আর মেইলদের শরীরে অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়, আর এই হরমোনের কারণেই একজন মেল, মেল হতে পারে। এই হরমোনের প্রভাবেই তাদের ভারী গলার স্বর, চেহারা, গোঁফ দাড়ি, ইত্যাদি হয়ে থাকে।

আর এই টেস্টোস্টেরন হরমোন এর কিছু অংশ থেকেই তৈরি হয় ডিএইচটি। ডিএইচটি আমাদের ফলিকলে গিয়ে আমাদের চুলকে দুর্বল করে দেয় যার কারণে আমাদের চুল সঠিক নিউট্রিয়েন্টস পায়না, আর আস্তে আস্তে ছোট এবং পাতলা হতে শুরু করে, আর একসময় এটা এতটাই ছোট হয়ে যায় যেটা ফলিকল থেকে বাইরেই বের হতে পারে না। আর এখান থেকেই আমাদের চুল ঝরে যাওয়া রোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। আর এটাই হলো আমাদের চুল ঝরে যাওয়া রোগের প্রধান কারণ।
কিন্তু যদি আপনার চুল ঝরে যাওয়া রোগ হয় তাহলে তখন আপনার কি করা উচিত? বা তখন আপনার কোন কাজগুলো করা উচিত নয়?
তো যদি আপনার চুল ঝরে যাওয়া রোগ হয়ে থাকে তাহলে সবথেকে প্রথম কাজ হলো আপনার হেয়ার ফল কে চিনতে হবে। আমাদের যে চুল ঝরে যাওয়া রোগ হয় সেটা দুই প্রকারের হয় প্রথমত জেনেটিকালি হেয়ার ফল, আর দ্বিতীয়তঃ লাইফ স্টাইল হেয়ার ফল। জেনেটিক গত হেয়ার ফল যেটা বংশ পরম্পরায় আপনার পূর্বপুরুষের থেকে পেয়েছেন যেমন আপনার পূর্বপুরুষ মানে আপনার বাবা, দাদু, দিদা এদের যদি চুল পড়ে যাওয়া রোগ থাকতো আর আপনারা যদিও এই সমস্যা থাকে তাহলে এটা আপনার জেনেটিক গত প্রবলেম। আর দ্বিতীয়তঃ হল লাইফ স্টাইল চুল ঝরে যাওয়া রোগ এটা আপনার খাওয়া-দাওয়ার উপর ডিপেন্ড করে যদি আপনি এমন কোন কিছু সেবন করতে থাকেন যাদে ডিএইচটি হরমোন এর পরিমাণ অনেক বেশি, বা যেটা আপনার ডিএইচটি হরমোন কে বাড়িয়ে দেয় তাহলে আপনার চুল পড়া রোগ বা চুল বেশি পড়বে।
তাই যদি আপনি চুল ঝরে যাওয়া রোগ থেকে বাঁচতে চান তাহলে সবার প্রথমে কয়েকটা বাজে কাজ করা আপনার অবশ্যই বন্ধ করে দেওয়া উচিত, যার ফলে আপনার ডিএইচটি হরমোন বৃদ্ধি পাওয়া কম হবে, তো সব থেকে বড় একটা ভুল যেটা ঠান্ডার সময় প্রায় মানুষই করে থাকে সেটা হল গরম পানি তে গোসল করা আমাদের মধ্যে অনেকেই ঠান্ডার সময় গরম পানিতে গোসল করে থাকি, আর সেই গরম পানিকে আমরা আমাদের চুলেও ঢেলে দেই। এই কারণে আমাদের চুলের হেয়ার ফলিকলগুলো থাকে যেগুলো আগে থেকেই দুর্বল ছিল, সেখানে গরম জল লাগে আর তখন সেটা পুরোপুরি ই নষ্ট হয়ে যায়। সেই কারণেই এই ভুলটি কখনোই করবেন না।
দ্বিতীয়তঃ আপনার স্ট্রেস যতটা পারবেন কম করতে হবে আপনাকে পুরোপুরি টেনশন ফ্রি থাকতে হবে, কারণ আমরা যখন টেনশানে থাকি তখন আমাদের শরীরের সবথেকে বেশি পরিমাণে ডি এইচ টি রেস করে আর এই ডি এইচ টি সবথেকে বেশি আমাদের চুলের উপর প্রভাব বিস্তার করে, এই কারণে আপনাকে অলওয়েজ stress-free থাকতে হবে, যার জন্য আপনি মেডিটেশনের সাহায্য নিতে পারেন কারণ সাইন্স দ্বারা এটা সম্পূর্ণ প্রমাণ যে সব থেকে বেশি শান্ত আর ভালো ফিল আপনি মেডিটেশনের সময় অনুভব করেন, আর শুধু এটাই নয় মেডিটেশন করার সময় আপনার বডি থাকে এমন কিছু ইঞ্জাইম রিলিজ হয় যেটা ডিএইচটিকে পুরোপুরি কম করে দেয়, তাই প্রত্যেকদিন কম করে ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন অবশ্যই করুন।

তৃতীয় ভুল যেটা আপনি করেন সেটা হলো চুল শুকানোর জন্য হেয়ারড্রায়ার ব্যবহার করা: আমাদের চুল আগে থেকেই পাতলা থাকে, আর যখন আমরা হেয়ার ড্রায়ারার ইউজ করি তখন চুলের ওপর একটা লেয়ার থাকে যে লেয়ার হেয়ার ড্রায়ারের কারণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। আর আমাদের চুল ও পুরোপুরি ভাবে নষ্ট হতে শুরু করে, আর সেই কারণেই আপনার চুল শুকানোর জন্য হেয়ার ড্রায়ারার ইউজ করবেন না।
তো মূলত এই কাজগুলি করলে আপনি আপনার চুল ঝরে যাওয়া রোগ থেকে বাঁচতে পারেন, তো আশা করছি বুঝতে পেরেছেন যে চুল ঝরে যাওয়া রোগ আসলে কেন হয় এবং এর থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন। এখন চলুন জেনে নিয়ে অ্যালোপেশিয়া হলে এর চিকিৎসা কিভাবে করবেন সেই সম্পর্কে।
অ্যালোপেসিয়ার চিকিৎসা কি?
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান NHS বলেছে সাধারণত চুল পড়া বা অ্যালোপেসিয়া স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। কিন্তু কী কারণে চোখ পড়ছে সেই কারণটিই চিহ্নিত করা প্রয়োজন সবার আগে, এবং কারণ শনাক্ত হওয়ার পর সে অনুযায়ী চিকিৎসা করলে উপশম হবে এই রোগের। কেননা মানসিক চাপ, আয়রনের ঘাটতি, প্রোটিনের অভাব, খুশকি, ক্যান্সারের চিকিৎসা, সহ নানা কারণে পড়তে পারে চুল। সেজন্য ঠিক সময় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া চিকিৎসা নেওয়া এবং কিভাবে এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায় সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
সর্বশেষ কথা:- প্রিয় পাঠক আজকের এই পোস্টটি যদি আপনি মনোযোগ সহকারে পড়ে থাকেন তাহলে আশা করছি আপনি অ্যালোপেসিয়ার কি এবং কিভাবে এই অ্যালোপেসিয়ার থেকে বাঁচতে পারেন তা জেনে গিয়েছেন। এরপরও অ্যালোপেসিয়ার সম্পর্কে কোন প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন আমরা চেষ্টা করব সেটির উত্তর দেওয়ার। আর পোস্টটি ভাল লাগলে আপনার বন্ধুদের কাছে শেয়ার করতে পারেন। আবার দেখা হবে পরবর্তী কোনো হেল্পফুল কনটেন্ট এ সবার সাথে সে পর্যন্ত নিজের খেয়াল রাখুন এবং আমাদের সাথেই থাকুন ধন্যবাদ।